একবার পরকীয়া করলে কি একজন মানুষ আবারও পরকীয়ায় জড়ানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে? মনোবিজ্ঞানের গবেষণা, আচরণগত ব্যাখ্যা এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
"Once a cheater, always a cheater."
এই কথাটি আমরা প্রায়ই শুনি। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা সামনে এলে অনেকে ধরে নেন, যে ব্যক্তি একবার পরকীয়া করেছেন, তিনি ভবিষ্যতেও একই কাজ করবেন।
কিন্তু মনোবিজ্ঞান কি সত্যিই এমনটাই বলে?
বাস্তবতা হলো, উত্তরটি এতটা সরল নয়। গবেষণা দেখায়, অতীতে পরকীয়ায় জড়িত থাকার ইতিহাস ভবিষ্যতে একই আচরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এটি কোনো অপরিবর্তনীয় নিয়তি নয়। মানুষের আচরণ পরিবর্তন হতে পারে, যদি সে নিজের আচরণের দায় স্বীকার করে, পরিবর্তনের জন্য কাজ করে এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করে।
এই নিবন্ধে আমরা দেখব গবেষণা কী বলছে, কেন কিছু মানুষ বারবার পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা কতটা বাস্তব।
অনেকেই বলেন, "পরকীয়া একটা নেশা।"
বৈজ্ঞানিকভাবে এই বক্তব্যটি সঠিক নয়।
বর্তমানে DSM-5-TR কিংবা ICD-11 কোনোটিই পরকীয়াকে স্বতন্ত্র মানসিক রোগ বা আসক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পরকীয়ার পেছনে কোনো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নেই।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পরকীয়া এমন একটি পুনরাবৃত্ত আচরণগত প্যাটার্ন (Recurrent Behavioral Pattern) হয়ে দাঁড়ায়, যা নির্দিষ্ট মানসিক চাহিদা, ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য বা সম্পর্কগত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এই বিষয়ে সবচেয়ে আলোচিত গবেষণাগুলোর একটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে।
Knopp এবং তাঁর সহকর্মীরা একাধিক সম্পর্কের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখেন, যারা পূর্ববর্তী সম্পর্কে পরকীয়ায় জড়িয়েছিলেন, তারা পরবর্তী সম্পর্কেও একই আচরণ করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী,
পূর্বে পরকীয়া করা ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে আবার পরকীয়া করার সম্ভাবনা প্রায় তিন গুণ বেশি ছিল, যারা আগে কখনও পরকীয়া করেননি তাদের তুলনায়।
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিন গুণ বেশি ঝুঁকি মানেই শতভাগ নিশ্চিত নয়।
মনোবিজ্ঞানে আমরা "Probability" বা সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করি, "Destiny" বা পূর্বনির্ধারিত ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়।
অতীতের আচরণ ভবিষ্যতের একটি শক্তিশালী পূর্বাভাস হতে পারে, কিন্তু সেটি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।
পরকীয়া সাধারণত একটি মাত্র কারণের ফল নয়। বরং একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও সম্পর্কগত কারণ একসঙ্গে কাজ করে।
মানুষের মস্তিষ্ক নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়। নতুন সম্পর্কের উত্তেজনা, অজানার আকর্ষণ এবং গোপনীয়তার রোমাঞ্চ অনেকের কাছে শক্তিশালী মানসিক পুরস্কার হিসেবে কাজ করতে পারে।
কিছু মানুষ নিজের মূল্য অন্যের মনোযোগ বা প্রশংসার মাধ্যমে অনুভব করেন।
যখন বৈবাহিক বা প্রেমের সম্পর্কে সেই স্বীকৃতি কমে যায়, তখন বাইরের সম্পর্ক সাময়িকভাবে আত্মতৃপ্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
অনেক সম্পর্কেই দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব, আবেগগত দূরত্ব, যোগাযোগের সমস্যা বা যৌন অসন্তুষ্টি থাকে।
এসব সমস্যা কখনো কখনো পরকীয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এটি পরকীয়ার নৈতিক বা ব্যক্তিগত দায়কে বৈধতা দেয় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য যেমন কম আত্মনিয়ন্ত্রণ, বেশি ইম্পালসিভিটি, অতিরিক্ত সেনসেশন সিকিং এবং কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ মাত্রার নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য পরকীয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে কোনো ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্যই একা কাউকে পরকীয়ায় বাধ্য করে না।
হ্যাঁ। অবশ্যই পারে।
মনোবিজ্ঞান মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে না।
কিন্তু পরিবর্তন শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মাধ্যমে আসে না।
বাস্তব পরিবর্তনের কিছু লক্ষণ হলো:
শুধু "আমি আর এমন করব না" বলা এবং প্রকৃত পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
যদি সম্পর্ক পুনর্গঠন করার কথা ভাবেন, তাহলে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন:
এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে।
একটি মাত্র আচরণ দিয়ে পুরো মানুষটিকে বিচার করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি পুনরাবৃত্ত আচরণকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়।
একজন ব্যক্তি একবার পরকীয়া করেছেন মানেই তিনি সারাজীবন একই কাজ করবেন, এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়।
আবার, অতীতের আচরণের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলাও ভুল হবে।
প্রতিটি ঘটনাই আলাদা। তাই বিচার নয়, বরং আচরণের প্যাটার্ন, দায়বোধ, অনুশোচনা এবং পরিবর্তনের আন্তরিকতাই মূল্যায়নের মূল বিষয় হওয়া উচিত।
না। বর্তমান মনোরোগ নির্ণয় নির্দেশিকা অনুযায়ী পরকীয়া কোনো মানসিক রোগ নয়।
না। এটি স্বীকৃত আসক্তি নয়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি পুনরাবৃত্ত আচরণগত প্যাটার্ন হিসেবে দেখা যেতে পারে।
না। গবেষণা বলছে ঝুঁকি বেশি থাকে, কিন্তু সবাই আবার একই আচরণ করেন না।
অনেক ক্ষেত্রে পারে। বিশেষ করে যখন উভয় পক্ষই সম্পর্ক পুনর্গঠনে আন্তরিক এবং বিশ্বাস পুনর্নির্মাণের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত থাকেন।
পরকীয়া সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত দুটি ধারণা হলো:
"একবার করলে সারাজীবন করবে।"
এবং
"ভালোবাসা থাকলে কেউ কখনও পরকীয়া করে না।"
বাস্তবে, দুটি বক্তব্যই অতিসরলীকৃত।
মানুষের আচরণ জটিল। সম্পর্কও জটিল।
গবেষণা আমাদের বলে, অতীতের আচরণ ভবিষ্যতের ঝুঁকি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। কিন্তু মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বাস্তব।
তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো না,
"সে একবার পরকীয়া করেছে কি না?"
বরং,
"সে কি নিজের আচরণের দায় নিয়েছে এবং পরিবর্তনের জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে?"
Allen, E. S., Atkins, D. C., Baucom, D. H., Snyder, D. K., & Gordon, K. C. (2005). Intrapersonal, interpersonal, and contextual factors in engaging in and responding to extramarital involvement. Clinical Psychology: Science and Practice, 12(2), 101–130.
Atkins, D. C., Baucom, D. H., & Jacobson, N. S. (2001). Understanding infidelity: Correlates in a national random sample. Journal of Family Psychology, 15(4), 735–749.
Fincham, F. D., & May, R. W. (2017). Infidelity in romantic relationships. Current Opinion in Psychology, 13, 70–74.
Glass, S. P., & Wright, T. L. (1992). Justifications for extramarital relationships: The association between attitudes, behaviors, and gender. Journal of Sex Research, 29(3), 361–387.
Knopp, K., Scott, S. B., Ritchie, L. L., Rhoades, G. K., Markman, H. J., & Stanley, S. M. (2017). Once a Cheater, Always a Cheater? Serial Infidelity Across Subsequent Relationships. Archives of Sexual Behavior, 46(8), 2301–2311. https://doi.org/10.1007/s10508-017-1018-1
📞 Book Your Therapy Session
https://wa.me/8801913392007